৩০ অক্টোবর ২০২৬ , ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

প্রায় ৫ লাখ শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেবে সরকার, ব্যয় ৬ হাজার ৫৮ কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপলোড সময় : ৩০-১০-২০২৬
প্রায় ৫ লাখ শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেবে সরকার, ব্যয় ৬ হাজার ৫৮ কোটি টাকা ছবিঃ সংগৃহীত

৬ হাজার ৫৮ কোটি ৪৯ লাখ টাকার একটি প্রকল্পে মাধ্যমিক, মাদ্রাসা, কারিগরি ও প্রাথমিক স্তরের প্রায় ৫ লাখ শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিতে চায় সরকার। শিক্ষার মান উন্নয়নই উদ্দেশ্য। পাশাপাশি আইসিটি ও টেকনোলজি ল্যাব বসানো, আধুনিক শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ এবং ১৫ হাজারের বেশি শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ ও সংস্কারের পরিকল্পনাও আছে।

এসব কাজ হবে প্রস্তাবিত ‘নেক্সটজেন সেকেন্ডারি এডুকেশন প্রোগ্রাম’ প্রকল্পের অধীনে, যার প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ওই অঙ্ক। খরচের প্রস্তাব অনুযায়ী মাধ্যমিক স্তরে যাবে ৩ হাজার ৩৯৭ কোটির কিছু বেশি, মাদ্রাসা ও কারিগরি স্তরে ২ হাজার ৩৭৩ কোটি, আর প্রাথমিক স্তরে ২৮৮ কোটি টাকা।

তথ্যগুলো পাওয়া গেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আলাদা প্রাথমিক খসড়া প্রকল্প প্রস্তাব থেকে। বাস্তবায়ন করবে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরগুলোই, তবে প্রস্তাবগুলো এখনো চূড়ান্ত রূপ পায়নি।

কর্মকর্তাদের ধারণা, অনুমোদন মিললে প্রাথমিক স্তর থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনার মান অনেকটা এগিয়ে যাবে, কারণ বিপুলসংখ্যক শিক্ষক প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ পাবেন। নতুন ভবন না তুলে বিদ্যমান শ্রেণিকক্ষ ওপরের দিকে বাড়িয়ে ও সংস্কার করে ‘সক্রিয়’ শ্রেণিকক্ষে রূপান্তর করা হবে—এটিকে প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল গত বুধবার আজকের পত্রিকাকে জানান, শিক্ষার মান উন্নয়নে বর্তমান সরকার নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে; শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষ সংস্কার এবং অ্যাক্টিভ লার্নিং ক্লাসরুম তৈরির উদ্যোগ তারই অংশ।

তিনি আরও বলেন, ‘এ প্রকল্পে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য দেশে কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করা, যাতে শিক্ষা লাভের পর কেউ বেকার না থাকে।’

বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২৫ অনুযায়ী, ২৪ হাজার ১৪৭টি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৬৮ জন, ৯ হাজার ২৯৬টি মাদ্রাসায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৭৫ জন এবং ২ হাজার ৭৪৮টি কারিগরি প্রতিষ্ঠানে ৩২ হাজার ৮৬৪ জন। তিন স্তরে মোট শিক্ষক ৬ লাখ ১০ হাজার ৬০৭ জন। পরিকল্পনা হলো, এর প্রায় ৮২ শতাংশকে প্রশিক্ষণ দেওয়া।

মাউশির প্রস্তাবে মাধ্যমিক শিক্ষার মান বাড়ানো এবং আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দুর্যোগ-সহনশীল শিক্ষণ-শিখন পরিবেশ গড়ার পদক্ষেপের কথা আছে। শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়াতে নানামুখী কার্যক্রমও থাকবে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা) ড. সরদার মো. কেরামত আলীর বক্তব্য, ‘প্রকল্প প্রস্তাবগুলো বর্তমানে অনুমোদনের নানা ধাপে রয়েছে। বলা যায়, প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন এখনো চূড়ান্ত নয়।’

মাউশির খসড়া বলছে, মাধ্যমিক স্তরের ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৬৪৩ জন শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসক দেশে ও বিদেশে পেশাগত উন্নয়ন প্রশিক্ষণ পাবেন।

এ খাতের প্রাক্কলিত খরচ ৩৫৩ কোটি ৬০ লাখ ২৮ হাজার ৪০০ টাকা। মাদ্রাসা ও কারিগরি স্তরে কমপক্ষে ১ লাখ শিক্ষকের প্রশিক্ষণের প্রস্তাব রয়েছে, যার খরচ ১০০ কোটি টাকার বেশি। বিভিন্ন স্তরে আরও ৩০ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসককে ধাপে ধাপে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথাও আছে প্রস্তাবগুলোতে।

মোট ২ হাজার ৮৫টি শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ ও রূপান্তরের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে মাদ্রাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানের জন্য: বাছাই করা ৪৯৫টি মাদ্রাসায় ১ হাজার ৪৮৫টি আর ২০০টি এসএসসি (ভোকেশনাল) বিদ্যালয়ে ৬০০টি। এর সঙ্গে থাকছে ৬৯৫টি স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ ও ৬৯৫টি আইসিটি ল্যাব। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে হবে বিজ্ঞানাগার এবং ডিজিটাল সুবিধাসহ শিক্ষকদের কমনরুম। কারিগরি শিক্ষার ১৪টি ট্রেডের জন্য তৈরি হবে ৫৭৬টি ডিজিটাল শিক্ষা কনটেন্ট।

মাধ্যমিক স্তরে ৩ হাজার শ্রেণিকক্ষ ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ এবং ৫ হাজার ২৫০টি শ্রেণিকক্ষকে জলবায়ু-সহনশীল মাল্টিমিডিয়া ও সক্রিয় শিখন উপযোগী করার কথাও বলা হয়েছে। নির্বাচিত ১ হাজার ৫০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বসবে আইসিটি ল্যাব, আরও ১ হাজার ৫০টি টেকনোলজি ল্যাব ও ১ হাজার ৫০টি ল্যাবরেটরি; সঙ্গে আসবাব সরবরাহের পরিকল্পনা।

প্রাথমিক স্তরের জন্য প্রস্তাবে সমন্বিত প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালুর কথা রয়েছে। এতে ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ, শিক্ষার্থীর দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন, শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়ন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থাভিত্তিক (জিআইএস) পরিবীক্ষণ এক সুতায় বাঁধা যাবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

শিক্ষক প্রশিক্ষণ আর অবকাঠামো উন্নয়নের এই পরিকল্পনাকে ইতিবাচক চোখেই দেখছেন শিক্ষাবিদেরা। তবে প্রশিক্ষণ যেন লোকদেখানো না হয় এবং সব কাজ যেন স্পষ্ট নীতিমালা মেনে হয়, সেদিকে জোর দিয়েছেন তাঁরা।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে এ প্রশিক্ষণ যেন নামকাওয়াস্তে না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আর অন্যান্য উন্নয়নও হতে হবে পরিকল্পিত। অর্থাৎ সব কার্যক্রমই সুস্পষ্ট নীতিমালার আওতায় করতে হবে।’



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ